একটি রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো তার কৃষক-শ্রমিকের ঘাম এবং দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের সাহস। জাতীয় অর্থনীতির এই প্রাণভোমরাদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে যখন কোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদিত হয়, তখন তা কেবল একটি দাপ্তরিক নথি থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক পরাধীনতার নীল নকশা।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার সাথে স্বাক্ষরিত বিতর্কিত বাণিজ্য চুক্তির গতিপ্রকৃতি ও শর্তাবলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের গ্রামীণ কৃষি থেকে শুরু করে শহুরে কলকারখানা সর্বত্রই এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
প্রথমেই আসা যাক কৃষিখাতের প্রসঙ্গে। আমাদের কৃষি আমাদের টিকে থাকার প্রধান শক্তি। চুক্তির আড়ালে বিদেশি কর্পোরেট বীজ ও রাসায়নিকের একচেটিয়া বাজার তৈরির যে সুযোগ রাখা হয়েছে, তা দেশের কোটি প্রান্তিক কৃষকের আত্মনির্ভরশীলতাকে ধ্বংস করবে। পেটেন্ট আইন ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের দোহাই দিয়ে যদি আমাদের আদি বীজ ও চাষাবাদ পদ্ধতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়, তবে কৃষকরা চিরতরে বিদেশি কোম্পানির দাসে পরিণত হবেন। সস্তা আমদানির চাপে দেশীয় সবজি ও শস্য চাষীরা যখন ন্যায্যমূল্য হারাবেন, তখন প্রশ্ন জাগে—এই তথাকথিত খাদ্য নিরাপত্তা আসলে কার জন্য?
শিল্প মালিকদের জন্য এই চুক্তি এক অসম যুদ্ধের নামান্তর। শুল্ক হ্রাসের সামান্য প্রলোভন দেখিয়ে আমাদের বিশাল বাজারকে বিদেশি পণ্যের জন্য অবারিত করে দেওয়া হয়েছে। যেখানে আমাদের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) এখনো শৈশব পার করেনি, সেখানে আমেরিকার মতো বিশাল অর্থনীতির সাথে অসম প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেওয়াটা এক প্রকার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা এবং নির্দিষ্ট দেশের তুলা বা সুতা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পকেও একমুখী সংকটে ফেলবে। ফলে আমাদের উদ্যোক্তারা নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা হারিয়ে কেবল নির্দিষ্ট দাতা গোষ্ঠীর আজ্ঞাবহ হয়ে থাকবেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই চুক্তির ফলে আমাদের ‘সার্বভৌম নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা’ সংকুচিত হচ্ছে। যদি অন্য কোনো দেশের সাথে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমাদের তৃতীয় পক্ষের অনুমতি বা শর্ত মেনে চলতে হয়, তবে তা সরাসরি আমাদের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার পরিপন্থী। দেশের গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিও এখানে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন এমন দীর্ঘমেয়াদী এবং বিতর্কিত চুক্তিতে সই করে, তখন তার নৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা যেখানে জড়িত, সেখানে জনগণের মতামত বা বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ ছাড়া এমন তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো?
সময় এসেছে এই দেশবিরোধী চুক্তির প্রতিটি ধারা জনসমক্ষে ব্যবচ্ছেদ করার। যে চুক্তি আমাদের কৃষককে ভূমিহীন করতে পারে, আমাদের শিল্পকে দেউলিয়া করতে পারে এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঋণের জালে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধতে পারে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আমরা স্পষ্ট বলতে চাই, বিদেশের সাথে সুসম্পর্ক আমরা অবশ্যই চাই, কিন্তু তা নিজের ঘরের খুঁটি উপড়ে ফেলে নয়। জাতীয় স্বার্থবিরোধী এই চুক্তি অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা এবং জনস্বার্থে তা বাতিল করার জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এখন দেশপ্রেমিক প্রতিটি নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব। আমাদের নীরবতা যেন আগামী প্রজন্মের জন্য একটি পরাধীন অর্থনীতির উত্তরাধিকার রেখে না যায়।
লেখক: মো. সেলিম আহমেদ
মহাসচিব, বাংলাদেশ জনদল (বিজেডি)
ভাইস-চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ পরিবেশ রক্ষা ও মানবাধিকার সংস্থা
সদস্য, এমপি প্রার্থী পরিষদ
সম্পাদক ও প্রকাশক, স্বাধীন টিভি বাংলা
যুগ্ম সম্পাদক, দৈনিক স্বাধীন কাগজ
উপদেষ্টা, বর্তমান নিউজ
শিক্ষানুরাগী ও সমাজকর্মী।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...