‘১৬ বছর নির্যাতন সহ্য করেও আজ আমরা মূল্যায়নহীন’-অভিযোগ ত্যাগী নেতাকর্মীদের
রবিউল ইসলাম, রাজশাহী প্রতিনিধি: রাজশাহী পুঠিয়া-দুর্গাপুর সংসদীয় এলাকায় বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও হতাশা ক্রমেই প্রকাশ্যে আসছে। ১৩ টি ইউনিয়নজুড়ে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বিগত সরকারের দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনামলে যারা মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার, জেল-জুলুম, মারধর ও বাড়িছাড়া হওয়ার মতো নানা নির্যাতন সহ্য করে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, তাদের একটি বড় অংশ এখনো যথাযথ মূল্যায়ন ও সাংগঠনিক গুরুত্ব পাচ্ছেন না।
তৃণমূলের একাধিক নেতাকর্মীর দাবি, বিগত সময়ে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রেখে যারা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর তাদের অনেকেই বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে এখন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এতে দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বিএনপি কর্মী বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছর তারা মামলা-মোকদ্দমা, হামলা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। অনেককে বাড়িঘর ছেড়ে আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে।
রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকার কারণে একের পর এক মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছে।
তাদের ভাষ্য, এখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের পর তারা প্রত্যাশা করেছিলেন, দলের দুঃসময়ে যারা পাশে ছিলেন, তাদের মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র তাদের সেই প্রত্যাশার সঙ্গে মিলছে না।
তাদের অভিযোগ, বর্তমানে দলীয় বিভিন্ন পর্যায়ে এমন কিছু ব্যক্তি প্রভাব বিস্তার করছেন, যারা বিগত সময়ে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন না। বরং তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করেছেন।
‘নেতাদের কাছে গিয়েও কথা বলার সুযোগ পাই না’পুঠিয়া-দুর্গাপুরের বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কয়েকজন নেতাকর্মী আক্ষেপ করে বলেন, দলের দুঃসময়ে যারা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন, তাদের অনেকেই এখন দলীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছেন না।
একজন তৃণমূল কর্মী বলেন, “বুকের মধ্যে অনেক কষ্ট জমে আছে। কাকে বলব, কে শুনবে, তা বুঝতে পারছি না। আমরা বছরের পর বছর দলের জন্য কষ্ট করেছি। অথচ এখন কোনো কাজ নিয়ে গেলে দেখা যায়, এমন লোকজনই আগে বসে আছেন, যাদের আমরা দুঃসময়ে রাজপথে দেখিনি।”
আরেকজন কর্মীর অভিযোগ, দলের কোনো কোনো স্থানীয় নেতার কাছে অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের গুরুত্ব বেশি পাওয়া যাচ্ছে। তাদের দাবি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত—এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে কেউ কেউ রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পাচ্ছেন। এসব অভিযোগও সংশ্লিষ্ট সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। মামলা ও আদালতে হাজিরা নিয়ে ক্ষোভ নির্যাতিত কয়েকজন নেতাকর্মী জানান, বিগত সময়ের রাজনৈতিক মামলাগুলোর কারণে এখনো তাদের আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। রাজশাহী আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিতে গিয়ে অর্থ, সময় ও শ্রম ব্যয় হচ্ছে।
তাদের অভিযোগ, এসব মামলা ও দীর্ঘদিনের হয়রানির কারণে অনেক পরিবার আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যারা রাজপথে ছিলেন, তারাই প্রকৃত ত্যাগী।
তৃণমূলের দাবি, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বিগত ১৬ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই বোঝা যাবে কারা প্রকৃত অর্থে দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন।
তারা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান করে প্রকৃত ত্যাগী, নির্যাতিত ও দীর্ঘদিনের নেতাকর্মীদের তালিকা তৈরি করা হোক। পাশাপাশি দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যাতে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক ব্যবসা কিংবা অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াতে না পারে, সে বিষয়েও কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...